ইসবগুলের ভুসির উপকারিতা এবং খাওয়ার সঠিক নিয়ম

ইসবগুলের ভুসির উপকারিতাইসবগুলের ভুসি ও বীজের প্রধান ব্যবহার কোষ্ঠকাঠিন্যে। আমরা সাধারণত এর ভুসিই বেশি ব্যবহার করি। কারণ, এটি সহজলভ্য। শরীরের নানা সমস্যায়, খাদ্যাভ্যাসের দরুন, ওষুধ খাওয়া, দীর্ঘ যাত্রায় বহুক্ষণ এক স্থানে অনড় বসে থাকা, এমনকি গর্ভবতী অবস্থায়ও কারও কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। অন্য ওষুধের সঙ্গে ইসবগুল পথ্য হিসেবেও খাওয়া যেতে পারে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বলে।

ইসবগুলের ভুসির উপকারিতা 

কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে

ইসবগুলে থাকে কিছু অদ্রবণীয় ও দ্রবণীয় খাদ্যআঁশের চমৎকার সংমিশ্রণ যা কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য খুব ভালো ঘরোয়া উপায় হিসেবে কাজ করে।এটি পাকস্থলীতে গিয়ে ফুলে ভেতরের সব বর্জ্য পদার্থ বাইরে বের করে দিতে সাহায্য করে। প্রাকৃতিকভাবে জলগ্রাহী হওয়ার কারনে পরিপাকতন্ত্র থেকে পানি গ্রহণ করে মলের ঘনত্বকে বাড়িয়ে দিয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ২ চামচ ইসবগুল এক গ্লাস কুসুম গরম দুধের সাথে মিশিয়ে প্রতিদিন ঘুমাতে যাবার আগে পান করে নিন।

ডায়রিয়া প্রতিরোধে

যদিও শুনলে অবাক লাগে, ইসবগুল একই সাথে ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য দুটিই প্রতিরোধ করতে সক্ষম। ডায়রিয়া প্রতিরোধে ইসবগুল দইয়ের সাথে মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়।কারন দইয়ে থাকা প্রোবায়োটিক পাকস্থলীর ইনফেকশন সারায় এবং ইসবগুল তরল মলকে শক্ত করতে সাহায্য করে খুব কম সময়ের মাঝে ডায়রিয়া ভালো করতে পারে। ডায়রিয়া প্রতিরোধে ২ চামচ ইসবগুল ৩ চামচ টাটকা দইয়ের সাথে মিশিয়ে খাবার পর খেতে হবে। এভাবে দিনে ২ বার খেলে বেশ কার্যকরী ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

অ্যাসিডিটি প্রতিরোধে

বেশির ভাগ মানুষেরই অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকে আর ইসবগুল হতে পারে এই অবস্থার ঘরোয়া প্রতিকার।ইসগুল খেলে তা পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে একটা প্রতিরক্ষা মূলক স্তর তৈরি করে যা অ্যাসিডিটির বার্ন থেকে পাকস্থলীকে রক্ষা করে। এছাড়া এটি ঠিক হজমের জন্য এবং পাকস্থলীর বিভিন্ন এসিড নিঃসরণে সাহায্য করে।ইসবগুল অ্যাসিডিটিতে আক্রান্ত হওয়ার সময়টা কমিয়ে আনে। প্রতিবার খাবার পর ২ চামচ ইসবগুল আধা গ্লাস ঠাণ্ডা দুধে মিশিয়ে পান করুন। এটি পাকস্থলীতে অত্যাধিক এসিড উৎপাদন কমাতে সাহায্য করে অ্যাসিডিটির মাত্রা কমায়।

ওজন কমাতে

ওজন কমানোর উদ্দেশ্যকে সফল করতে ইসবগুল হচ্ছে উত্তম হাতিয়ার। এটি খেলে বেশ লম্বা সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয় এবং ফ্যাটি খাবার খাওয়ার ইচ্ছাকে কমায়। এছাড়াও ইসবগুল কোলন পরিষ্কারক হিসেবেও পরিচিত।এটি পাকস্থলী থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে, হজম প্রক্রিয়াকে আরো বেশি কার্যকর করে স্বাস্থ্যবান থাকতে সাহায্য করে। ভেষজ শাস্ত্র অনুযায়ী এটি পাকস্থলীর দেয়ালে যেসব বর্জ্য পদার্থ থাকে তা পরিষ্কার করতে সাহায্য করে যা অন্যান্য হজমজনিত সমস্যাও দূর করে। কুসুম গরম পানিতে ২ চামচ ইসবগুল ও সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে নিয়ে ভাত খাবার ঠিক আগে খেতে হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে খেলেও তা ওজন কমাতে সাহায্য করবে।

হজমক্রিয়ার উন্নতিতে

দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় খাদ্যআঁশে ভরপুর ইসবগুল হজম প্রক্রিয়াকে সঠিক অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে।এটি শুধু পাকস্থলী পরিষ্কার রাখতেই সাহায্য করে না এটি পাকস্থলীর ভেতরের খাবারের চলাচলেও এবং পাকস্থলীর বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনেও সাহায্য করে।তাই হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে নিয়মিতভাবে ইসবগুল খেতে পারেন। এছাড়া মাঠা বা ঘোলের সাথে ইসবগুল মিশিয়ে খেতে পারেন ভাত খাওয়ার পরপরই। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে তা হল ইসবগুল মিশিয়ে রেখে না দিয়ে সাথে সাথেই খেয়ে ফেলতে হবে।

হৃদস্বাস্থ্যের সুস্থতায়

ইসবগুলে থাকা খাদ্যআঁশ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে যা আমাদেরকে হৃদরোগের থেকে সুরক্ষিত করে।হৃদরোগের সুস্থতায় ইসবগুল সাহায্য করে কারন এটি উচ্চ আঁশ সমৃদ্ধ এবং কম ক্যালরিযুক্ত। ডাক্তাররা সব সময় হৃদরোগ প্রতিরোধে এমন খাবারের কথাই বলে থাকেন।এটি পাকস্থলীর দেয়ালে একটা পাতলা স্তরের সৃষ্টি করে যার ফলে তা খাদ্য হতে কোলেস্টেরল শোষণে বাধা দেয় বিশেষ করে রক্তের সিরাম কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। এছাড়াও এটি রক্তের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরিয়ে দেয় যা থাকলে ধমনীতে ব্লকের সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে তা হৃদরোগ এবং কোরোনারী হার্ট ডিজিজ থেকে আমাদের রক্ষা করে। তাই হার্টকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত ভাবে খাবারের ঠিক পরে বা সকালে ঘুম থেকে উঠে ইসবগুল খান।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে

ইসবগুল যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের জন্য খুবই ভালো। এটি পাকস্থলীতে যখন জেলির মত একটি পদার্থে রূপ নেয় তখন তা গ্লুকোজের ভাঙ্গন ও শোষণের গতিকে ধীর করে। যার ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকে। খাবার পর নিয়মিত ভাবে দুধ বা পানির সাথে ইসবগুল মিশিয়ে পান করুন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে।তবে দইয়ের সাথে মিশিয়ে খাবেন না এতে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।

রক্তে কোলেস্টেরল কমায় 

এ ভুসি খেলে আমাদের অন্ত্রে একধরনের স্তর তৈরি হয়। যা কোলেস্টেরল শোষণে বাধা দান করে। ফলে আমাদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তাই হৃদরোগীদের জন্য দারুণ একটি খাবার এটি।

পাইলস প্রতিরোধে

প্রাকৃতিক ভাবে দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় খাদ্যআঁশে ভরপুর ইসবগুল যারা পায়ুপথে ফাটল এবং পাইলসের মত বেদনাদায়ক সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য উত্তম। এটা শুধু পেট পরিষ্কার করতেই সাহায্য করেনা মলকে নরম করতে সাহায্য করে অন্ত্রের পানিকে শোষণ করার মাধ্যমে এবং ব্যাথামুক্ত অবস্থায় তা দেহ থেকে বের হতেও সাহায্য করে। এটি প্রদাহের ক্ষত সারাতেও সাহায্য করে। ২ চামচ ইসবগুল কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে ঘুমাতে যাবার আগে পান করুন।

ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার নিয়ম

  • ১-২ চা চামচ ২৫০ বা ১ গ্লাস পানি দিয়ে মিশিয়ে প্রতিদিন খেতে পারেন। পানির সঙ্গে মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে খাবেন যাতে শরীরের ভেতরে ঢুকে এটি ফোলে। চিনি মেশানোর দরকার নেই।
  • ২ চা চামচ ইসবগুল ২৫০ মিলি কুসুম গরম পানির সঙ্গে ১-২ চা চামচ লেবুর রসের সঙ্গে মিশিয়ে সকালে নাস্তার পরে খেলে শরীরের ওজন কমে যায়। সারা বছর ধরে খেলে পেট ভুট ভুট করে, ডায়রিয়াও হতে পারে। একটানা ৭-১০ দিনের বেশি খাওয়া উচিত নয়। 

  • ২ চা চামচ ভুসি ১৫ মিলিলিটার টক দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাবারের পরে খাবেন। এরপর ১ গ্লাস পানি খেয়ে নেবেন। ডায়রিয়াজনিত রোগে এটি প্রোবায়োটিক হিসেবে কাজ করে।

  • ২ চা চামচ ইসবগুল ১ গ্লাস ঠাণ্ডা পানির সঙ্গে খেতে পারেন। খাওয়ার পর পেট-বুক জ্বালাপোড়া করা ও পেটে গ্যাস হওয়া রিফ্লাক্স রোগের উপসর্গ। খাবারের পর পাকস্থলীর গায়ে এটি আবারণ সৃষ্টি করে। ফলে এসিড থেকে শরীরে ক্ষতি কম হয়। এই খাবারের ফলে শর্করা জাতীয় খাবার কম শোষিত হয়। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এটি পরোক্ষভাবে উপকার করে।

Next Post Previous Post