Garlic Benefits


রসুন আমাদের প্রতিদিনের খাবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের প্রায় প্রতিটি তরকারিতে আমরা রসুন ব্যবহার করে থাকি। আর এই রসুনেই রয়েছে থিয়ামিন, রিবোফ্লাভিন, নিয়াসিন, প্যান্টোথিক এসিড, ফোলেট, এবং সেলেনিয়ামের মতো উপাদান। আর আমরা জানি যে, সেলেনিয়াম ক্যানসার প্রতিরোধে এক কার্যকারি ভূমিকা পালন করে থাকে। 

তাছাড়া রসুন আমাদের কৃমি নাশ করতে কাজ করে থাকে, শ্বাস কষ্ট কমাতে সাহায্য করে, হজমে সহায়তা করতেও সাহায্য করে। যাদের এলার্জি আছে তাদের জন্যও রসুন এক বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে।  আমাদের এই নিবন্ধনে আমরা রসুনের উপকারিতা, পুষ্টিগুণ, খাওয়ার নিয়ম, এবং অপকারিতা নিয়ে আলোচনা করবো। রসুন নিয়ে আপনাদের করা অন্যান্য প্রশ্নেরও উত্তর দিবো।

রসুনের উপকারিতা 

রসুন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় 

রসুন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দারুণ কাজ করে। তার কারণ হলো রসুনে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুনগুন যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। বিশেষ করে খালিপেটে রসুন খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। তাই বলা যায় আপনি যদি খালিপেটে প্রতিদিন অল্প অল্প করে রসুন খান তাহলে আস্তে আস্তে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

রসুন রক্ত সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়ায় 

রসুন রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে দারুণ ভুমিকা পালন করে। আপনি যদি সকালে খালি পেটে কয়েক কোয়া রসুন  খান তাহলে আপনার রক্ত সঞ্চালনতা বৃদ্ধি পাবে। এতে আপনার যে উপকারটি হবে তা হলো, আপনার যতো রক্ত বাধাগ্রস্ত হয়ে রোগের সৃষ্টি হতো, তা আর হবে না।

রসুন হৃদপিণ্ডের শক্তি বর্ধক হিসেবেও কাজ করে

রসুন আমাদের হৃদপিণ্ডের জন্য এক আদর্শ খাবার। তার কারণ হলো যারা বুকের বাঁ পাশে ব্যাথা অনুভব করেন কিংবা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হয়, তাদের জন্য প্রতিদিন সকালে কিছু রসুনের কোয়া পানির সাথে খেলে অনেক উপকার পাবেন। য়ার ফলে আপনার হৃদপিণ্ড অনেক শক্তিশালী হবে এবং আপনার রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পাবে। আর যাদের হার্টের মধ্যে ব্লক আছে, তাদের এই ব্লক আর বাড়বে না। আপনার বুকের ব্যাথাও আস্তে আস্তে প্রশমিত হবে। যার ফলে আপনার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে আর কোনো সমস্যা হবে না। 


রসুন পুরুষের যৌন ক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে

প্রতিটা পুরুষেই চায় তার যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। আর এই জন্যই আপনাকে প্রতিদিন খালি পেটে দুই থেকে চার কোয়া রসুন খেতে হবে। প্রতিদিন খাওয়ার ফলে আস্তে আস্তে আপনার যৌনসক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। আর আমরা জানি যে, পুরুষের ক্ষমতার মূল উৎস হচ্ছে তার রক্তের সাবলীল গতি। আর আমরা এটাও যানি যে রসুন রক্তের গতি বাড়ায়। আর একজন পুরুষের রক্তের গতি যতো বৃদ্ধি পাবে ততো বেশি যৌন ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। 

রসুন উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে 

যাদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সমস্যা আছে তাদের জন্য রসুন অতিবো কার্যকরি খাবার। আমরা জানি শরিরের এলডিল বেড়ে যাওয়ার কারণে রক্তচাপ বেড়ে যায়। আর এই এলডিলকে কমানোর জন্য রসুন ভালো কাজ করে থাকে। তাই যদি খালিপেটে প্রতিদিন কিছু কিছু রসুন খান তাহলে আপনাদের উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কিত আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

রসুন বিভিন্ন সংক্রমণ প্রতিরোধ করে

আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের শরীরের মধ্যে যে কোনো সময় সংক্রমণ ঘটতে পারে। আর সংক্রমণ হলো এমন এক অবস্থা যার কোন পূর্বলক্ষণ আমরা বুজতে পারি না। তাই প্রতিদিন সকালে খালি পেটে রসুন খেলে শরীরের সংক্রমণ ব্যাবস্থা জোরদার হবে। 

রসুন ফুসফুসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে

ফুসফুস আমাদের শরীরের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী এক জিনিস। আর এই ফুসফুসকেই অনেক সময় সংক্রমণ হতে হয়। যেমন আপনি এভাবে ধরতে পারেন যে, এলার্জি সমস্যা, ঠান্ডা লাগার প্রবণতা থেকে ফুসফুসের সংক্রমণ ঘটতে পারে। যা থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে রসুনের রস খেতে হবে নিয়মিত। আপনার নিয়মিত রসুনের রস খাওয়াই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে আপনার ফুসফুসের সংক্রমণ এবং শরীরের অন্যান্য সংক্রমণ। 


রসুন রক্ত পরিশোধিত করতে পারে

আমরা যেটা সহজ ভাষায় বুঝে থাকি যে, পরিশোধিত মানে হচ্ছে ছাকা। আর রসুনের মধ্যে এই ক্ষমতা রয়েছে যে, রসুন রক্ত পরিশোধিত করতে পারে। তাই প্রতিদিন খালি পেটে দুই কোয়া রসুন খেয়ে নিন। এটার ফলে আপনার রক্তের পরিশোধন ক্ষমতা বাড়বে। আর আপনার মধ্যে কাজের গতিও বৃদ্ধি পাবে। 

রসুন ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে 

আমরা অনেকেই আছি ত্বকের প্রতি অনেক যত্নশীল। যারা ত্বকের প্রতি অনেক যত্নশীল তারা প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খালি পেটে খেয়ে নিন এতে আপনার ত্বক ভালো থাকবে। ত্বকের মধ্যে বয়সের কোন ছাপ পড়বে না। আর আপনার চেহারায়ও কোন দাগ থাকবে না। 

রসুন শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোলা কমাতে পারে 

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোলা পিন্ড থাকে। এই পিন্ড বাড়েও না আবার কমেও না কিন্তু কোন ব্যাথাও করে না। এই ফোলা জায়গায় আবার মিশেও যায় না। এমন শরীরের ফোলা মুছতে আপনাকে ছয় থেকে দশটি রসুনের কোয়া প্রতিদিন সকালে খেতে হবে খালি পেটে। আপনি চাইলে দুপুরে ও রাতেও খাবারের পর খেতে পারেন। এভাবে যদি আপনি খেতে থাকেন তাহলে একদিন আপনার শরীরের ফোলা অংশটি মুছে যাবে।


রসুন হাড়ের শক্তি বর্ধক হিসেবেও কাজ করে 

নির্দিষ্ট একটা সময়ের পর বিভিন্ন কারণে নারীদের হাড়ের শক্তি কমে যায়। যার জন্য আপনি যদি প্রতিদিন দুই থেকে তিন গ্রাম রসুন খেয়ে নেন তাহলে আপনার শরীরের ইস্টোজেনের মাত্রায় অনেকটা ভারসাম্য বিরাজ করে। আর যাদের এই মাত্রাটা কম থাকে তাদের সুবিধা হলো এই মাত্রা তাদের বেলায় বৃদ্ধি পায়। যার ফলে হাড়সংক্রান্ত সমস্যা অনেকটাই উপশম হয়। আবার যে নারীর মেনোপোজ হয়ে গেছে তাঁরাও নিয়মিত রসুন খেতে পারেন, খেলে অনেক উপকার পাবেন। 

রসুনের পুষ্টিগুণ 

এক চা চামচ রসুনের পুষ্টিগুণ হলোঃ

  • ক্যালরিঃ ৪
  • প্রোটিনঃ ০.১৮ গ্রাম
  • ফ্যাটঃ ০.০১ গ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেটঃ ০.৯৩ গ্রাম
  • ফাইবারঃ ০.১ গ্রাম
  • প্রাকৃতিক সুগারঃ ০.৯৩ গ্রাম
  • ক্যালসিয়ামঃ ৫ মিলিগ্রাম 
  • আইরনঃ ০.০৫ মিলিগ্রাম 
  • ম্যাগনেশিয়ামঃ ১ মিলিগ্রাম 
  • পটাশিয়ামঃ ১১ মিলিগ্রাম 
  • ভিটামিন সিঃ ০.৯ মিলিগ্রাম 

রসুনের অপকারিতা

রসুনের অপকারিতা নিয়ে বলতে গেলে আমাদের বিভিন্ন গবেষণার রিপোর্টের কথা বলা লাগে। তেমনি একটা গবেষণা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে। সেই গবেষণাতে দেখা গেছে যে, খালি পেটে কাঁচা রসুন খেলে অনেকের বুক জ্বালাপোড়া করে, বমিভাব, এমনকি বমিও হতে পারে। আবার অতিরিক্ত রসুন খেলে হাইফিমা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। এছাড়াও চোখের আইরিশ ও কর্নিয়ার মাঝে রক্তক্ষরণ ঘটতে পারে।

তাছাড়া আরও কিছু অপকারিতা রয়েছে রসুনেরঃ

মাথা ঘোরানো 

আপনি যদি অতিরিক্ত রসুন খান তাহলে আপনার মাথা ঘোরানোর মতো সমস্যা হতে পারে। এর কারণ হিসাবে আমরা দেখতে পারি যে, বেশি রসুন খেলে কমে যেতে পারে রক্তচাপ। আর আমরা জানি যে, নিন্ম রক্তচাপের ফলে আমাদের শরীরের মধ্যে অনেক দুর্বলতা দেখা দেয় এবং যার ফলে মাথা ঘোরানো এবং বমি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

গর্ভবতী নারীর জন্য রসুন ক্ষতিকর
 
গর্ভবতী নারীর জন্য বেশি রসুন খাওয়া খুব একটা নিরাপদ কিছু নয়। গর্ভাবস্থায় যদি বেশি রসুন খান তাহলে আপনার প্রসব বেদনা বাড়তে পারে। আবার যেসব মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তাদেরও বেশি রসুন খাওয়া ঠিক হবে না, কারণ আপনার দুধের স্বাদ বদলে যেতে পারে। যা আপনার শিশুর জন্য তেমন ভালো নয়।

যকৃতের ক্ষতি হতে পারে 

আমাদের শরীরের মধ্যে যে কয়েকটি অঙ্গ দারুণ কাজ করে তার মধ্যে যকৃত অন্যতম। এটি চর্বি ও প্রোটিনের বিপাক, রক্ত পরিশোধন, শরীর থেকে অ্যামোনিয়া অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। তাই আপনি যদি অতিরিক্ত রসুন খেতে থাকেন, তাহলে রসুনে থাকা অ্যালিসিন নামক উপাদান যকৃতে বিষক্রিয়া তৈরি করে, যা যকৃতের ক্ষতি সাধন করে।

ডায়রিয়া 

আমরা অনেক মানুষের সাথে আলাপ করে দেখেছি যে, তাদের অতিরিক্ত রসুন খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া হয়েছিল। তার কারণ হিসাবে আমরা বলতে পারি যে, রসুনের মধ্যে থাকা সালফার যা পেটের মধ্যে গ্যাস তৈরি করে। যার কারনেই ডাইরিয়া হয়েছিল। 

অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া 

বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল গবেষণায় একটি তথ্য উঠে এসেছে যে, একটানা অনেকদিন ধরে রসুন খেতে থাকলে প্রচুর ঘাম হয় শরীরে। 

দুর্গন্ধ 

আমরা যখনি কোন খাবার গ্রহন করি, তখন আমাদের মুখের মধ্যে একটা দুর্গন্ধ হয়। আর রসুনের বেলায় এমটা হওয়ার কারণ হলো অতিরিক্ত সালফার থাকার জন্য। 

এখন রসুন সম্পর্কিত আপনাদের কিছু প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করবো,

রসুন খাওয়ার নিয়ম 

যারা পূর্ণবয়স্ক আছেন তাদের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩ তিনটি রসুনের কোয়া খেতে বলেছেন পুষ্টিবিদরা। প্রতিদিন সকালে এক কোয়া রসুন কাঁচা চিবিয়ে খেলে আপনি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। আর রান্নার বেলায় আপনি কুঁচি কুঁচি করে রসুন কেটে দিলে তা সক্রিয় উপাদান হিসাবে অ্যালিসিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে যা আপনার খাবারকে করবে পুষ্টি সমৃদ্ধ। 

রসুনের উপকারিতা চুলের জন্য 

আমরা জানি যে রসুন চুলের জন্য অনেক ভালো ভূমিকা রাখে। কারণ রসুনে রয়েছে প্রচুর পরিমানে জিঙ্ক এবং কপার যা মাথায় তালুর রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে। মাথার খুশকিও অনেক কমায়।

ওজন কমাতে রসুনের উপকারিতা 

ওজন কমাতে রসুনের তুলনা নাই। কেননা রসুনে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন সি, ফাইবার, ক্যালশিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, আয়রন ও সোডিয়াম। আপনি ওজন কমানোর জন্য সকালে খালি পেটে ২ থেকে ৩ টা রসুনের কোয়া কুচি করে পানি দিয়ে গিলে খেতে পারেন।

ঠান্ডায় রসুনের উপকারিতা 

আপনার যদি ঠান্ডা লাগে তখন আপনি রসুন খেলে উপকার পাবেন। কারণ রসুনে থাকা উপাদান জীবাণু প্রতিরোধ করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। রসুনে থাকা সালফার শরীরের শ্বেত রক্ত কণিকার সঙ্গে ভাইরাসের সংযোগ ঘটতে দেয় না। যার ফলে সর্দি এবং অনান্যা ফ্লুতে সহজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। 

নবীনতর পূর্বতন