Ads- 1

ইসলামিক কবিতা

আমরা অনেকেই মনকে প্রশান্ত করার জন্য কবিতা পড়ে থাকি বা শুনে থাকি। আর ইসলামিক কবিতা হলে তো কোনো কথাই নাই। তাই আজকের এই পোস্টে আমরা আপনাদের সাথে কিছু ইসলামিক কবিতা দিবো, যেগুলো পড়ে আপনি মনকে আরাম দিতে পারবেন। 

বিখ্যাত মুসলিম মনীষীদের ইসলামিক কবিতা 

বন্দনা 

শাহ মুহম্মদ সগীর

প্রথমে প্রণাম করি এক করতার।

যেই প্রভুর জীবদানে স্থাপিলা সংসার।।

দ্বিতীয়ে প্রণাম কঁরো মাও বাপ পাত্র।

যান দয়া হন্তে জন্ম হৈল বসুধায়।।

পিঁপড়ার ভয়ে মাও না থুইলা মাটিতে।

কোল দিয়া বুক দিয়া জগতে বিদিত।।

অশক্য আছিলুঁ দুর্বল ছাবাল

তান দয়া হন্তে হৈল এ ধড় বিশাল।।

না খাই খাওয়াএ পিতা না পরি পরাএ।

কত দুক্ষে একে একে বছর গোঞাএ।।

পিতাক নেহায় জিউ জীবন যৌবন।

কনে না সুধিব তান ধারক কাহন।।

ওস্তাদে প্রণাম করো পিতা হন্তে বাড়।

দোসর-জনম দিলা তিঁহ সে আহ্মার।।

আহ্মা পুরাবাসী আছ জথ পৌরজন।

ইস্ট মিত্র আদি জথ সভাসদগগণ।

তান সভান পদে মোহার বহুল ভকতি।

সপুটে প্রণাম মোহর মনোরথ গতি।।

মুহম্মদ সগীর হীন বহোঁ পাপ ভার।

সভানক পদে দোয়া মাগোঁ বার বার।

--------------------------

সাত সাগরের মাঝি 

ফররুখ আহমদ

কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা ।

নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা ।

দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।

তবু জাগলে না ? তবু, তুমি জাগলে না ?

সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকো জাহাজ,

অচল ছবি সে, তসবির যেন দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ ।

হালে পানি নাই, পাল তার ওড়ে নাকো,

হে নাবিক! তুমি মিনতি আমার রাখো;

তুমি ওঠে এসো, তুমি ওঠে এসো মাঝি মাল্লার দলে

দেখবে তোমার কিশতি আবার ভেসেছে সাগর জলে,

নীল দরিয়ায় যেন সে পূর্ণ চাঁদ

মেঘ তরঙ্গ কেটে কেটে চলে ভেঙে চলে সব বাঁধ ।

তবু তুমি জাগো, কখন সকাল ঝরেছে হাসনাহেনা

এখনো তোমার ঘুম ভাঙলো না ? তবু, তুমি জাগলে না ?

দুয়ারে সাপের গর্জন শোনো নাকি ?

কত অসংখ্য ক্ষুদধিতের সেথা ভির,

হে মাঝি ! তোমার বেসাতি ছড়াও, শোনো,

নইলে যে-সব ভেঙে হবে চৌচির ।

তুমি দেখছ না, এরা চলে কোন আলেয়ার পিছে পিছে ?

চলে ক্রমাগত পথ ছেড়ে আরও নিচে !

হে মাঝি ! তোমার সেতারা নেভেনি একথা জানো তো তুমি,

তোমার চাঁদনি রাতের স্বপ্ন দেখেছে এ মরুভূমি,

দেখো জমা হল লালা রায়হান তোমার দিগন্তরে;

তবু কেন তুমি ভয় পাও, কেন কাঁপো অজ্ঞাত ডরে !

তোমার জাহাজ হয়েছে কি বানচাল,

মেঘ কি তোমার সেতারা করে আড়াল ?

তাই কি অচল জাহাজ ভাঙা হাল

তাই কি কাঁপছে সমুদ্র ক্ষুধাতুর

বাতাস কাঁপানো তোমার ও ফাঁকা পাল ?

জানি না, তবু ডাকছি তোমাকে সাত দরিয়ার মাঝি,

প্রবাল দ্বীপের নারিকেল শাখা বাতাসে উঠেছে বাজি ?

এ ঘুমে তোমার মাঝিমাল্লার ধৈর্য নেইকো আর,

সাত সমুদ্র নীল আকাশে তোলে বিষ ফেনভার,

এদিকে অচেনা যাত্রী চলেছে আকাশের পথ ধরে

নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা ।

বেসাতি তোমার পূর্ণ করে কে মারজানে মর্মরে ?

ঘুমঘোরে তুমি শুনছ কেবল দুঃস্বপ্নের গাঁথা ।

উচ্ছৃঙ্খল রাত্রির আজো মেটেনি কি সব দেনা ?

সকাল হয়েছে । তবু জাগলে না ? তবু তুমি জাগলে না ?

তুমি কি ভুলেছ লবঙ্গ ফুল, এলাচের মৌসুমী,

যেখানে ধূলিতে কাঁকরে দিনের জাফরান খোলে কলি,

যেখানে মুগ্ধ ইয়াসমিনের শুভ্র ললাট চুমি

পরীর দেশের স্বপ্ন সেহেলি জাগে গুলে বকাওলি ?

ভুলেছ কি সেই প্রথম সফর জাহাজ চলেছে ভেসে

অজানা ফুলের দেশে,

ভুলেছ কি সেই জমরুদ তোলা স্বপ্ন সবার চোখে

ঝলসে চন্দ্রলোকে,

পাল তুলে কোথা জাহাজ চলেছে কেটে কেটে নোনা পানি,

অশ্রান্ত সন্ধানী ।

--------------------------

পাঞ্জেরি 

ফররুখ আহমদ

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?

এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?

সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?

তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;

অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?

দীঘল রাতের শ্রান্তসফর শেষে

কোন দরিয়ার কালো দিগন্তে আমরা পড়েছি এসে?

এ কী ঘন-সিয়া জিন্দেগানীর বা’ব

তোলে মর্সিয়া ব্যথিত দিলের তুফান-শ্রান্ত খা’ব

অস্ফুট হয়ে ক্রমে ডুবে যায় জীবনের জয়ভেরী।

তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;

সম্মুখে শুধু অসীম কুয়াশা হেরি।

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?

বন্দরে বসে যাত্রীরা দিন গোনে,

বুঝি মৌসুমী হাওয়ায় মোদের জাহাজের ধ্বনি শোনে,

বুঝি কুয়াশায়, জোছনা- মায়ায় জাহাজের পাল দেখে।

আহা, পেরেশান মুসাফির দল।

দরিয়া কিনারে জাগে তক্দিরে

নিরাশায় ছবি এঁকে!

পথহারা এই দরিয়া- সোঁতারা ঘুরে

চলেছি কোথায়? কোন সীমাহীন দূরে?

তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;

একাকী রাতের ম্লান জুলমাত হেরি!

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?

শুধু গাফলতে শুধু খেয়ালের ভুলে,

দরিয়া- অথই ভ্রান্তি- নিয়াছি ভুলে,

আমাদেরি ভুলে পানির কিনারে মুসাফির দল বসি

দেখেছে সভয়ে অস্ত গিয়াছে তাদের সেতারা, শশী।

মোদের খেলায় ধুলায় লুটায়ে পড়ি।

কেটেছে তাদের দুর্ভাগ্যের বিস্বাদ শর্বরী।

সওদাগরের দল মাঝে মোরা ওঠায়েছি আহাজারি,

ঘরে ঘরে ওঠে ক্রন্দনধ্বনি আওয়াজ শুনছি তারি।

ওকি বাতাসের হাহাকার,- ও কি

রোনাজারি ক্ষুধিতের!

ও কি দরিয়ার গর্জন,- ও কি বেদনা মজলুমের!

ও কি ধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী।

পাঞ্জেরি!

জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি,

জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি!

দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি!!

--------------------------

আযান

কায়কোবাদ

কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।

মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর

আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।

কি মধুর আযানের ধ্বনি!

আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে,

কি যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধমনে

কি নিশীথে, কি দিবসে মসজিদের পানে।

হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে,

কি যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে-

কত সুধা আছে সেই মধুর আযানে।

নদী ও পাখির গানে তারই প্রতিধ্বনি।

ভ্রমরের গুণ-গানে সেই সুর আসে কানে

কি এক আবেশে মুগ্ধ নিখিল ধরণী।

ভূধরে, সাগরে জলে নির্ঝরণী কলকলে,

আমি যেন শুনি সেই আযানের ধ্বনি।

আহা যবে সেই সুর সুমধুর স্বরে,

ভাসে দূরে সায়াহ্নের নিথর অম্বরে,

প্রাণ করে আনচান, কি মধুর সে আযান,

তারি প্রতিধ্বনি শুনি আত্মার ভিতরে।

নীরব নিঝুম ধরা, বিশ্বে যেন সবই মরা,

এতটুকু শব্দ যবে নাহি কোন স্থানে,

মুয়াযযিন উচ্চৈঃস্বরে দাঁড়ায়ে মিনার ‘পরে

কি সুধা ছড়িয়ে দেয় উষার আযানে!

জাগাইতে মোহমুদ্ধ মানব সন্তানে।

আহা কি মধুর ওই আযানের ধ্বনি।

মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সমধুর

আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।

--------------------------

আশীর্বাদ

কাজী নজরুল ইসলাম

আপনার ঘরে আছে যে শত্রু

তারে আগে করো জয়,

ভাঙো সে দেয়াল, প্রদীপের আলো

যাহা আগুলিয়া রয়।

অনাত্বীয়রে আত্বীয় করো,

তোমার বিরাট প্রাণ

করে না কো যেন কোনোদিন কোনো

মানুষে অসম্মান।

সংসারের মিথ্যা বাঁধন

ছিন্ন হোক আগে,

কবে সে তোমার সকল দেউল

রাঙিবে আলোর রাগে।

--------------------------

উমর ফারুক

কাজী নজরুল ইসলাম

তিমির রাত্রি – ‘এশা’র আযান শুনি দূর মসজিদে।

প্রিয়-হারা কার কান্নার মতো এ-বুকে আসিয়ে বিঁধে!

আমির-উল-মুমেনিন,

তোমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন।

তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,

বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী?

ও-আযান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?

মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্ববান?

আবার লুটায়ে পড়ি।

‘সেদিন গিয়াছে’ – শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।

উমর! ফারুক! আখেরি নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু!

আহ্বান নয় – রূপ ধরে এস – গ্রাসে অন্ধতা-রাহু!

ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!

সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ।

শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের

দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের

ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি

আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!

ইসলাম – সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি?

পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।

আজ বুঝি – কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর-

‘মোরপরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর।’

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি

খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি

সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে,

ঊর্ধ্বের যারা – পড়ছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে।

শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ

করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ।

সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,

বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে।

হেরি পশ্চাতে চাহি-

তুমি চলিয়াছ রৌদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি

জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি

বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি।

দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা বলেছে শত্রু শেষে-

উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে!

হায় রে, আধেক ধরার মালিক আমির-উল-মুমেনিন

শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন

সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো ‘খবুজ’ রুটি

একটি মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু তিন মুঠি।

প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি

চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি!

মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,

সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে।

কিছুদূর যেতে উঠ হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, ‘ভাই

পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই

উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে,

তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।’

…ভৃত্য দস্ত চুমি

কাঁদিয়া কহিল, ‘উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?

উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি

আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?’

খলিফা হাসিয়া বলে,

‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে।

রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, ‘উমর! ওরে

করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।’

কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই।

আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু, মোর অধিকার নাই।

আরাম সুখের, -মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা।

ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা।

ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,

মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।

জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা,

কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দী’ বিশ্ববীণা।

জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব-

অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, ‘জয় জয় হে মানব।’

তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনি ক’ কারে ভয়,

সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়।

মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,

তাই মহাবীর খালদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান,

সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,

বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না।

মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,

মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা – সেদিন সে বিভাবরী

নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে

মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুদাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে

কাঁদিতেছে আর দুখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়,

উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকুলে চায়।

শুনিয়া সকল – কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে

বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে,

বলিলে, ‘এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের ‘পরে,

আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে’।

কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,

বলিলে, ‘বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা!

রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?

মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার

প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি’ – চলিলে নিশীথ রাতে

পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে!

এত যে কোমল প্রাণ,

করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক’ অপমান!

মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে

মেরেছ দোররা, মরেছে পুত্রে তোমার চোখের পরে!

ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি-

‘অপরাধ করে তোরি মতো স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।’

আবু শাহমার গোরে

কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে।

খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,

‘কোথায় খলিফা’ কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,

একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে,

রৌদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে।

হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট!

অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,

মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই

তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।

(সংক্ষেপিত)

--------------------------

এক আল্লাহ জিন্দাবাদ 

কাজী নজরুল ইসলাম

উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ;

আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।

উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ,

আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ।

উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই;

নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই!

ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে,

দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে।

ওরা নির্জীব; জিব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে,

ওরা জিন, প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে।

মোরা বাংলার নব যৌবন,মৃত্যুর সাথে সন্তরী,

উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি।

মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী,

অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী।

ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি।

মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি।

উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার,

ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার!

আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্তি হেরি মানব

ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব।

হুতুম প্যাচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়,

কাকে আর তাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চষ্ণু ক্ষয়।

বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চায়, চাহে জ্যোতি;

তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি।

তারা বলে, যদি প্রার্থনা মোরা করি তাঁর কাছে এক সাথে,

নিত্য ঈদের আনন্দ তিনি দিবেন ধুলির দুনিয়াতে।

সাত আসমান হতে তারা সাত-রঙা রামধনু আনিতে চায়,

আল্লা নিত্য মহাদানী প্রভূ, যে যাহা চায়, সে তাহা পায়।

যারা অশান্তি দুর্গতি চাহে, তারা তাই পাবে, দেখো রে ভাই,

উহারা চলুক উহাদের পথে, আমাদের পথে আমরা যাই।

ওরা চাহে রাক্ষসের রাজ্য, মেরা আল্লার রাজ্য চাই,

দ্বন্দ্ব-বিহীন আনন্দ-লীলা এই পৃথিবীতে হবে সদাই।

মোদের অভাব রবে না কিছুই, নিত্যপূর্ণ প্রভূ মোদের,

শকুন শিবার মত কাড়াকাড়ি করে শবে লয়ে– শখ ওদের!

আল্লা রক্ষা করুন মোদেরে, ও পথে যেন না যাই কভূ,

নিত্য পরম-সুন্দর এক আল্লাহ্ আমাদের প্রভূ।

পৃথিবীতে যত মন্দ আছে তা ভালো হোক, ভালো হোক ভালো,

এই বিদ্বেষ-আঁধার দুনিয়া তাঁর প্রেমে আলো হোক, আলো।

সব মালিন্য দূর হয়ে যাক সব মানুষের মন হতে,

তাঁহার আলোক প্রতিভাত হোক এই ঘরে ঘরে পথে পথে।

দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী, তারা গুন্ডাদল

তারা দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল।

ওরা নিশিদিন মন্দ চায়, ওরা নিশিদিন দ্বন্দ চায়,

ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়!

তাড়াবে এদের দেশ হতে মেরে আল্লার অনাগত সেনা,

এরাই বৈশ্য, ফসল শৈস্য লুটে খায়, এরা চির চেনা।

ওরা মাকড়সা, ওদের ঘরের ঘেরোয়াতে কভু যেয়ো না কেউ,

পর ঘরে থাকে জাল পেতে, ওরা দেখেনি প্রাণের সাগর ঢেউ।

বিশ্বাস করো এক আল্লাতে প্রতি নিঃশ্বাসে দিনে রাতে,

হবে দুলদুল – আসওয়ার পাবে আল্লার তলোয়ার হাতে।

আলস্য আর জড়তায় যারা ঘুমাইতে চাহে রাত্রিদিন,

তাহারা চাহে না চাঁদ ও সূর্য্য, তারা জড় জীব গ্লানি-মলিন।

নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান

সর্ব-ক্লৈব্য করিয়াছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান!

ওরা কাদা ছুড়ে বাঁধা দেবে ভাবে – ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ,

মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব – “এক আল্লাহ জিন্দাবাদ”।

--------------------------

মুনাজাত

কাজী নজরুল ইসলাম

আমারে সকল ক্ষুদ্রতা হতে

বাঁচাও প্রভু উদার।

হে প্রভু! শেখাও – নীচতার চেয়ে

নীচ পাপ নাহি আর।

যদি শতেক জন্ম পাপে হই পাপী,

যুগ-যুগান্ত নরকেও যাপি,

জানি জানি প্রভু, তারও আছে ক্ষমা-

ক্ষমা নাহি নীচতার।।

ক্ষুদ্র করো না হে প্রভু আমার

হৃদয়ের পরিসর,

যেন সম ঠাঁই পায়

শত্রু-মিত্র-পর।

নিন্দা না করি ঈর্ষায় কারো

অন্যের সুখে সুখ পাই আরো,

কাঁদি তারি তরে অশেষ দুঃখী

ক্ষুদ্র আত্মা তার।।

নবীনতর পূর্বতন