neem leaves benefits

নিম পাতার উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। নিম পাতা আমাদের রক্তের সুগার লেভেল কম রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া রক্ত নালীকে আরও প্রসারিত করে রক্ত সংবহন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে। 

আমরা সকলেই জানি যে, নিম একটি ঔষধি গাছ। যার ঢাল থেকে শুরু করে পাতা সবই কোনো না কোনো ভাবে আমাদের শরীরের উপকারে আসে। নিমের পাতা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভালো করে। 

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিম পাতা অনেক ভালো। তাই যাদের ডায়াবেটিস আছে তারা প্রতিদিন নিম পাতার রস করে খান। অল্প খেলেও এটি প্রতিদিন খান তাহলে আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আমাদের আজকের এই নিবন্ধনে নিম পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। 

নিম পাতার উপকারিতা 

নিম পাতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিম পাতার ভূমিকা অপরিসীম। আপনি কিছু নিম পাতা যদি চুর্ণ করে এক গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে প্রতিদিন পান করতে পারেন তাহলে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

নিম পাতা চুলকানি বা খোস পাচড়ার জন্য ভালো 

যাদের শরীরের মধ্যে চুলকানি অথবা খোস পাচড়া জনিত সমস্যা আছে তাদের নিমপাতার পানি অনেক উপকারি। তাই প্রতিদিন নিমপাতা পানির সাথে সিদ্ধ করে তারপর গোসল করে নিন। তাছাড়া নিম পাতা বা নিমের ফুল পেস্ট করে শরীরের চুলকানো জায়গায় লাগান। এভাবে কিছু দিন লাগানোর পর দেখবেন আপনার চুলকানি ভালো হয়ে গেছে। 

চুলকানো জায়গায় আরু একটি উপায়ে আপনি নিম পাতা ব্যবহার করতে পারেন। যেমন, নিম পাতা ভিজিয়ে তারপর গুঁড়ো করে তার সাথে অল্প সরিষার তেল মিশিয়ে চুলকানো জায়গায় লাগান। আবার যদি নিম পাতার সাথে কাঁচা হলুদের পেস্ট করে আক্রান্ত স্থানে প্রলেপের মতো লাগাতে পারেন তাহলে আপনার চুলকানি ও পুরানো ক্ষত দূর হতে ৭ থেকে ১০ দিনের মতো সময় লাগবে।

আরো জানুনঃ মেথির উপকারিতা, পুষ্টিগুণ, ব্যবহার, এবং অপকারিতা

নিম পাতা কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে 

কৃমি শিশুদেরকে খুব ভুগিয়ে থাকা। কৃমির জন্য শিশুরা নানা ধরনের রোগে ভুগে থাকে। শিশুদের পেট বড় হয়ে যায় বা ফুলে যায় আবার অনেক ক্ষেত্রে চেহারা ফ্যকাশে মতো হয়ে যায়। তাই শিশুদের এই সমস্যা গুলো দূর করতে হলে নিম পাতার কোন জুড়ি নেই। 

শিশুদেরকে নিম পাতা খাওয়ানোর জন্য আপনাকে ৫০ মিলিলিটার পরিমাণে নিমের মূল ছালের গুঁড়া দিনে অন্তত ৩ বার করে সামান্য গরম পানি দিয়ে খাইয়ে দিবেন। তাছাড়া ৪ থেকে ৫ গ্রাম নিমের ছাল গুঁড়া করে সামান্য লবণসহ সকালে খালি পেটে খেলে কৃমি জনিত কোন সমস্যা থাকবে না। তার জন্য আপনাকে এটা পুরো সপ্তাহ সেবন করতে হবে। আর শিশুদের বেলায় ১ থেকে ২ গ্রাম সেবন করতে হবে। 

নিম পাতা ত্বকের জন্য বেশ উপকারী 

আমরা যারা রুপচর্চা করতে ভালোবাসি তাদের জন্য নিম পাতা হতে পারে আদর্শ উপকরণ। তার কারণ হলো নিম পাতা ত্বকের দাগ ও ব্রণ দূর করতে পারে এবং আপনার ত্বকের ভালো ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই নিম পাতাকে আপনার কিছু উপায়ে ত্বকের জন্য ব্যবহার করতে হবে। 

আপনি ত্বকের জন্য ঘরে তৈরি নিম পাতার বড়ি খেতে পারেন। আর বড়ি তৈরির জন্য নিম পাতা ভালো করে ধুয়ে পেস্ট করে নিন। তারপর হাত দিয়ে অথবা অন্য কোন বড়ির ফ্রেমে রেখে বড়ি তৈরি করে নিন। একদিন রোদে শুকাতে পারেন তাহলে বড়ি গুলো বেশ কিছুদিন ভালো থাকবে। আর বড়ি গুলো ভালো একটা বয়ামে সংরক্ষণ করুন। আর প্রতিদিন একটি করে বড়ি খেয়ে নিন তাতে ত্বকের পরিবর্তন তারাতাড়ি লক্ষ্য করবেন। 

আবার অনেকেই ত্বকের ব্রণ নিয়ে অনেক ডিপ্রেশনে ভুগেন। কিন্তু আপনি জানেন না যে নিম পাতা আপনার এই ডিপ্রেশন অনেক কমিয়ে দিতে পারে। যখনি আপনার ত্বকে ব্রণের সংক্রমণ হবে তখনি আপনি নিমপাতা পেস্ট করে ব্রণের জায়গায় লাগিয়ে দিন। এভাবে বেশ কিছুদিন লাগালে আর ব্রণ জনিত সমস্যা আপনার থাকবে না।

আর যাদের মাথার ত্বকের মধ্যে চুলকানি আছে তারা নিম পাতার রস করে মাথায় লাগান। এভাবে কিছুদিন লাগালে মাথার চুলকানি উদাও হয়ে যাবে। 

প্রতিদিন কিছু নিম পাতা আর সামান্য হলুদ পেস্ট করে যদি ত্বকে লাগান তাহলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বহুগুন বেড়ে যাবে এবং আপনার স্কিন টোন আস্তে আস্তে ঠিক হবে। আর এটি মাথায় রাখুন, যদি হলুদ ব্যবহার করেন তাহলে রোদ এড়িয়ে চলুন।

আরো জানুনঃ খেজুরের উপকারিতা, পুষ্টিগুণ, ব্যবহার, এবং অপকারিতা

নিম পাতা দাঁতের রোগ সাড়াতে সক্ষম 

যদি আপনি নিম পাতার ছাল গুঁড়া করে বা নিমের ঢাল দিয়ে দাঁত মাজেন তাহলে দাঁত অনেক মজবুত হয়। আর মজবুত দাঁতে সহজে পোকামাকড় আক্রমণ করতে পারে না। আর বিশেষ করে দাঁতের অন্যান্য ছোট খাটো রোগ থেকে আপনি রক্ষা পাবেন। আপনি নিম পাতার রস পানিতে মিশিয়ে আলতোভাবে মুখের ভিতরে দিয়ে দাঁত ধুয়ে ফেলুন। এভাবে নিমপাতার রস দিয়ে দাঁত ধুলে, দাঁতের পচন, রক্তপাত ও মাড়ির ব্যাথা অনেক কমে যাবে। 

নিম পাতা রক্তের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখে

যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের জন্য নিম পাতা অনেক ভালো কাজ করে। নিম পাতা রক্তের সুগার লেভেল কমাতে সাহায্য করে। তার পাশাপাশি রক্ত নালীকে প্রসারিত করে রক্ত সংবহন উন্নত করে। তাই প্রতিদিন সকালে খালি পেটে গোলমরিচ ও নিম পাতা পেস্ট করে খেলে আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে। 

নিম পাতা চুলের জন্য অনেক ভালো 

সুন্দর, সিল্কি ও দৃষ্টিনন্দন চুল আমাদের সৌন্দর্যের একটি অংশ। আর এই সুন্দর চুল আরও সুন্দর করতে নিম পাতা ভালো ভুমিকা পালন করে। চুলের খুশকি দূর করতে নিম পাতার রস খুবই কার্যকরী। চুলের খুশকি দূর করার জন্য সপ্তাহে অন্তত একবার নিম পাতা ভালো করে বেটে চুলে লাগিয়ে ঘন্টা খানিক রেখে দিন। এক ঘন্টা রাখার পর ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। এভাবে করলে চুল পড়া কমে যাবে পাশাপাশি চুল নরম হবে ও কোমল হবে। দেখতেও অনেক সুন্দর দেখাবে।

নিম পাতা উকুন দূর করতে পারে 

উকুন যারা কোনো অবস্থাতেই সাড়াতে পাড়ছেন না তাদের জন্য নিম পাতা হতে পারে আদর্শ উপকরণ। নিম পাতা ব্যবহারের ফলে মাথার উকুন সমস্যা দূর হয়। এই জন্য আপনাকে নিমের পেস্ট তৈরি করে মাথায় লাগাতে হবে। উকুন দূর করার জন্য সপ্তাহে অন্তত দুই দিন নিমের পেস্ট মাথায় লাগাতে হবে এবং বেশ কিছুক্ষণ মাথায় লাগিয়ে রাখতে হবে এবং পরে শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন এবং চিরুনি দিয়ে মাথা ভালো ভাবে আঁচড়ান। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাথার উকুন সমস্যা থাকবে না। 

নিম পাতা খুশকি দূর করে

নিমের পাতার মধ্যে ব্যাকটেরিয়া এবং ফানগি নাশক উপাদান থাকে যা মাথার খুশকি দূর করতে পারে। আবার নিম পাতা মাথার তালুর শুষ্কতা ও চুলকানো দূর করে দিতে পারে। এই জন্য আপনাকে ৪ কাপ পানিতে ১ মুঠো নিম পাতা নিয়ে গরম করতে হবে ততক্ষণ যতোক্ষণ না পানিটি সবুজ আকার ধারণ করে। তারপর গরম করা পানি ঠান্ডা হলে চুলে শ্যাম্পু করার পর ওই পানি দিয়ে মাথা ভালো ভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এই কাজটি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন করুন তাহলে আপনার মাথায় খুশকি থাকবে না।

নিম পাতা ওজন কমাতে সাহায্য করে 

নিম পাতা ওজন কমাতে ভালো ভূমিকা রাখে। ওজন কমানোর জন্য নিমের ফুলের জুস খেলে বেশি উপকারে আসে। কেননা নিমের ফুল শরীরের মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে শরীরের চর্বি ভাঙ্গতে সহায়তা করে। তাই এক মুঠো নিম ফুল চূর্ণ করে তার সাথে ১ চা চামচ মধু এবং আধা চামচ লেবুর রস দিয়ে ভালো ভাবে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে পান করুন। এভাবে পান করে গেলে আপনার ওজন আস্তে আস্তে কমতে শুরু করবে। 

নিম পাতা রক্ত পরিষ্কার করতে পারে 

নিম পাতার রস রক্ত পরিষ্কার করে ও শর্করার মাত্রা কমায়। তার পাশাপাশি রক্ত চলাচল বাড়িয়ে হৃদপিণ্ডের গতি স্বাভাবিক রাখে। আর যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের জন্যও নিমের পাতা অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। 

নিমের পাতা পোকামাকড়ের কামড়ের ক্ষত দূর করতে পারে 

কোন পোকামাকড়ের কামড়ে যদি শরীরের মধ্যে ক্ষত তৈরী হয় তাহলে ক্ষত স্থানে নিমের শিকড় বা পাতা বেটে লাগালে ব্যাথা কমে যায়। 

নিমের পাতা জন্ডিসের জন্য ভালো 

জন্ডিস হলে যদি নিয়মিত সকালে নিম পাতার রসের সাথে মধু মিশিয়ে খালি পেটে খান তাহলে জন্ডিস থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এজন্য আপনাকে ২৫ থেকে ৩০ ফোঁটা নিম পাতার রসের সাথে মধু মিশিয়ে খেতে হবে। জন্ডিস নিরাময়ের জন্য অন্তত এক সপ্তাহ খেতে হবে।

নিম পাতার অন্যান্য উপকারী দিকঃ

  • নিম পাতা ভাইরাস জনিত রোগীদের জন্য ভালো। 
  • নিম পাতা ম্যালেরিয়ার জন্য ভালো। 
  • নিম পাতা বাতের ব্যথার জন্য ভালো। 
  • নিম পাতা ব্রণ দূর করতে পারে। 
  • নিম পাতা ক্ষত নিরাময় করতে পারে। 
  • নিম পাতা এলার্জির জন্য ভালো। 
  • নিম পাতা একজিমার জন্য ভালো। 
  • নিম পাতা ক্যান্সারের জন্য ভালো। 
  • নিম পাতা রাতকানা রোগীর জন্য ভালো। 
  • নিম পাতা গুটি বসন্ত রোগীদের জন্য ভালো। 

নিম পাতার পুষ্টিগুণ

নিম পাতার মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন (৭.১%), কার্বোহাইড্রেট (২২.৯%), খনিজ পদার্থ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন সি, এবং ক্যারোটিন। 

তাছাড়া নিম পাতার মধ্যে রয়েছে গ্লুটামিক অ্যাসিড, টাইরোসিন, অ্যাসপার্টিক এসিড, অ্যালানাইন, প্রালাইন, সিস্টাইন, অ্যামিনো এসিড এবং ফ্যাটি এসিড। 

৩৫ গ্রাম নিম পাতার পুষ্টিগুণঃ

  • ক্যালোরিঃ ৪৫
  • প্রোটিনঃ ২.৪৮ গ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেটঃ ৮.১ গ্রাম
  • ফ্যাটঃ ০.০৩ গ্রাম
  • ক্যালসিয়ামঃ ১৭৮.৫ মিলিগ্রাম 
  • আয়রনঃ ৫.৯৮ মিলিগ্রাম 
  • ফাইবারঃ ৬.৭৭ গ্রাম
  • ম্যাগনেসিয়ামঃ ৪৪.৪৫ মিলিগ্রাম 
  • ফসফরাসঃ ২৩ মিলিগ্রাম 
  • পটাশিয়ামঃ ৮৮.৯ মিলিগ্রাম 
  • সোডিয়ামঃ ২৫.২৭ মিলিগ্রাম 

নিম পাতার অপকারিতা 

নিম পাতার যেমন উপকারিতা রয়েছে অনেক তেমনি কিছু অপকারিতাও রয়েছে। নিম পাতার অপকারিতা গুলো যেমনঃ

১. নিম পাতার অপকারিতার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় ছোট বাচ্চাদের কথা। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিম তেলের ব্যবহার কিংবা নিম তেল খাওয়া মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বমি বমি ভাব হতে পারে বা মস্তিষ্কের ব্যাধি দেখা দিতে পারে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

২. গর্ভবতী নারীর জন্য নিম পাতা তেমন ভালো খাবার নয়। নিম পাতা গর্ভপাতের অন্যতম কারণ হতে পারে। তাছাড়া প্রসূতি মহিলাদের নিমপাতা থেকে দূরে থাকা উচিত। 

৩. যাদের নিম্ন রক্তচাপ আছে তাদের নিমপাতা বর্জন করা উচিত। কেননা নিম পাতা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। নিম্ন রক্তচাপ রোগীদের বেলায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রয়োজন পরে না। তাই যাদের নিম্ন রক্তচাপ আছে তারা নিম পাতা থেকে বিরত থাকবেন। 

৪. খালি পেটে বেশি দিন নিম পাতা খাবেন না তাহলে উপকারের চেয়ে বেশি অপকারই হবে।

নবীনতর পূর্বতন